NGO Branch

দিশা এনজিও শাখা সমূহ ২০২৬ (আপডেট তথ্য)

দিশা এনজিও শাখা সমূহ সম্পর্কে জানেন কি ? বাংলাদেশের গ্রামীণ ও প্রান্তিক এলাকায় দারিদ্র্য বিমোচন এবং সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর মধ্যে দিশা এনজিও (Development Initiative for Social Advancement) একটি উল্লেখযোগ্য নাম, যা দীর্ঘদিন ধরে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের, বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বী করে তুলছে। ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থা বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার কার্যক্রম বিস্তার করেছে। দিশা এনজিও শাখা সমূহ এর মাধ্যমে লাখো মানুষ সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন। এই আর্টিকেলে আমরা দিশা এনজিও শাখা সমূহ ২০২৬ এর আপডেট তথ্যসহ সংস্থার বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব, যাতে আপনি সহজেই সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

দিশা এনজিও সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

দিশা এনজিও একটি অরাজনৈতিক, অলাভজনক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা, যা ১৯৯৩ সালে কুমিল্লা জেলার চান্দিনা উপজেলার বরকাইত গ্রামে প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থার প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মো. শহীদ উল্লাহর নেতৃত্বে এটি শুরু হয়েছিল মাত্র একটি ছোট অফিস এবং সীমিত সম্পদ নিয়ে। মূল লক্ষ্য ছিল চরম দারিদ্র্যে থাকা পরিবারগুলোকে, বিশেষ করে নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা।

আজ দিশা এনজিও বাংলাদেশের ১৯টি জেলায় কাজ করছে, যার মধ্যে কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, ফেনী, গাজীপুর, কিশোরগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জসহ অন্যান্য জেলা রয়েছে। সংস্থাটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে অবদান রাখছে, যেমন দারিদ্র্য হ্রাস (SDG 1), নারী ক্ষমতায়ন (SDG 5), ক্ষুধা নিরসন (SDG 2) এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (SDG 8)।

বর্তমানে (২০২৫-২০২৬ আপডেট অনুসারে) দিশা এনজিওর মাইক্রোফাইন্যান্স প্রোগ্রামে প্রায় ১ লাখ ১৭ হাজারেরও বেশি সদস্য রয়েছে, যাদের মধ্যে ৯৮% নারী। এছাড়া ৮২ হাজারেরও বেশি সক্রিয় ঋণগ্রহীতা রয়েছে। সংস্থাটি এনজিও অ্যাফেয়ার্স ব্যুরো এবং মাইক্রোফাইন্যান্স রেগুলেটরি অথরিটির অধীনে নিবন্ধিত। দিশা এনজিও শাখা সমূহ শুধু ঋণ প্রদান করে না, বরং প্রশিক্ষণ, সচেতনতা এবং সামাজিক উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই পরিবর্তন আনে।

দিশা এনজিও শাখা তালিকা

দিশা এনজিও বর্তমানে ১৯টি জেলায় ১০২-১০৪টি শাখা (ব্রাঞ্চ) পরিচালনা করছে, যা ১১০টি উপজেলায় ছড়িয়ে আছে। এই শাখাগুলো মাইক্রোফাইন্যান্স, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কৃষি সেবা প্রদান করে। নিচে কিছু প্রধান শাখার তালিকা দেওয়া হলো (অফিসিয়াল সোর্স থেকে আপডেটেড):

শাখার নাম ঠিকানা ইমেইল যোগাযোগ নম্বর
বরকাইত ভিলা ও পোস্ট: বরকাইত, বরকাইত বাজার, চান্দিনা, কুমিল্লা barkait@disa-bd.org ০১৭৩৩-২১৯৯১৯
চান্দিনা হাসপাতাল রোড, চান্দিনা, কুমিল্লা chandina@disa-bd.org ০১৭৩৩-২১৯৯২১
বাড়ুড়া মিউনিসিপালিটি অফিসের কাছে, সুসন্দা রোড, বাড়ুড়া, কুমিল্লা barura@disa-bd.org ০১৭৩৩-২১৯৯২৩
পায়ালগাছা ভিলা ও পোস্ট: পায়ালগাছা, বাড়ুড়া, কুমিল্লা payalgacha@disa-bd.org ০১৭৩৩-২১৯৯২৫
দেবীদ্বার শেখ মঞ্জিল, দেবীদ্বার নতুন মার্কেট (ইসলামী ব্যাংকের কাছে), কুমিল্লা debidwar@disa-bd.org ০১৭৩৩-২১৯৯২৭
কালাকাছুয়া ভিলা ও পোস্ট: কালাকোচুয়া বাজার, বুড়িচং, কুমিল্লা kalakachua@disa-bd.org ০১৭৩৩-২১৯৯২৯
কচুয়া কচুয়া সদর, টি অ্যান্ড টি অফিসের কাছে, গুলবাহার রোড, চাঁদপুর kachua@disa-bd.org ০১৭৩৩-২১৯৯৩৩
হাজীগঞ্জ তোরাগড়, হাজীগঞ্জ, চাঁদপুর hajiganj@disa-bd.org ০১৭৩৩-২১৯৯৪৫
ফরিদগঞ্জ কালিরবাজার রোড, ফরিদগঞ্জ, চাঁদপুর faridganj@disa-bd.org ০১৭৬১-৪৯২৫২০
সোনারগাঁও থানা রোড, পৌর ভবনাথপুর, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ sonargaon@disa-bd.org ০১৭৩৩-২১৯৯৬৫

(এটি আংশিক তালিকা; সম্পূর্ণ ১০৪টি শাখার বিস্তারিত তালিকা এবং আপডেটের জন্য অফিসিয়াল ওয়েবসাইট www.disabd.org ভিজিট করুন বা PDF ডাউনলোড করুন। দিশা এনজিও শাখা সমূহ এর নেটওয়ার্ক ক্রমাগত বাড়ছে, যা স্থানীয় জনগণের জন্য সেবা আরও সহজলভ্য করে তুলেছে।)

দিশা এনজিওর প্রধান সেবাসমূহ

দিশা এনজিও শুধু অর্থনৈতিক সহায়তা নয়, বরং সামগ্রিক উন্নয়নের উপর জোর দেয়। প্রধান সেবাসমূহের তালিকা:

  • মাইক্রোফাইন্যান্স: ক্ষুদ্র ঋণ, সঞ্চয় এবং আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ।
  • শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন: দিশা ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (DIST) এর মাধ্যমে টেকনিক্যাল প্রশিক্ষণ, যেমন কম্পিউটার, সেলাই, কৃষি প্রযুক্তি।
  • স্বাস্থ্য সেবা: সদস্যদের চিকিত্সা সহায়তা, স্বাস্থ্য সচেতনতা ক্যাম্প এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।
  • কৃষি ও পশুসম্পদ উন্নয়ন: কৃষকদের জন্য ঋণ, প্রশিক্ষণ এবং বাজার সংযোগ।
  • পরিবেশ সুরক্ষা: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৃক্ষরোপণ এবং জলবায়ু-স্মার্ট প্রকল্প।
  • সামাজিক ক্ষমতায়ন: নারী ও যুবকদের জন্য সচেতনতা, নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ এবং ভায়োলেন্স প্রতিরোধ।

এই সেবাগুলো দিশা এনজিও শাখা সমূহ এর মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে পাওয়া যায়, যা জনগণের জীবনমান উন্নত করে।

দিশা এনজিওর মাইক্রোফাইন্যান্স প্রোগ্রাম

দিশা এনজিওর মাইক্রোফাইন্যান্স প্রোগ্রাম সুবিধাবঞ্চিত নারীদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা প্রদানের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার। এটি ৬,০৫১টি গ্রামীণ সংগঠন (Village Organizations) এর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বর্তমানে (২০২৫ সেপ্টেম্বর আপডেট) ঋণ বকেয়া প্রায় ৩,৮৩৯ কোটি টাকা, যা ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি এবং জরুরি প্রয়োজন মেটাতে ব্যবহৃত হয়। সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তির সুবিধা রয়েছে, যা গ্রাহকদের জন্য সুবিধাজনক। প্রোগ্রামটি বাংলাদেশের মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

আরও জানতে পারেনঃ রিক এনজিও লোন পদ্ধতি ২০২৬( আপডেট তথ্য)

মাইক্রোফাইন্যান্স প্রোগ্রামের প্রকারভেদ

দিশা বিভিন্ন ধরনের ঋণ প্রদান করে, যা গ্রাহকের প্রয়োজন অনুসারে ডিজাইন করা:

ঋণের প্রকার বিবরণ ঋণের পরিমাণ (টাকা) সময়কাল
জাগরণ (RMC) গ্রামীণ ও নগরীয় ক্ষুদ্র ঋণ ৩০,০০০ – ৫ লাখ ৬-১২ মাস
অ্যাগ্রোশর মাইক্রো এন্টারপ্রাইজ লোন ১-১০ লাখ ১-২ বছর
বুনিয়াদ অতি দরিদ্রদের জন্য ১০,০০০ – ৫০,০০০ ৬-৯ মাস
সুফলন কৃষি ও মৌসুমীয় ঋণ ২০,০০০ – ২ লাখ ঋতু অনুসারে
আইএলএফএফ উদ্ভাবনী ঋণ তহবিল ৫০,০০০ – ১ লাখ ১ বছর
ডব্লিউসিএডি জল সংক্রান্ত ঋণ ৩০,০০০ – ১ লাখ ৬-১২ মাস

এই প্রকারভেদগুলো গ্রাহকের ব্যবসা বা প্রয়োজন অনুসারে নমনীয়।

দিশা এনজিও লোনের যোগ্যতা

লোন পাওয়া সহজ, তবে কিছু মৌলিক শর্ত পূরণ করতে হয়:

  • বয়স ১৮-৬০ বছরের মধ্যে।
  • বাংলাদেশী নাগরিক এবং সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের সদস্য।
  • নিয়মিত আয়ের উৎস বা ছোট ব্যবসার প্রমাণ।
  • গ্রুপ মেম্বারশিপ (১৫-৩০ জনের গ্রামীণ সংগঠন)।
  • স্থায়ী ঠিকানা এবং বৈধ পরিচয়পত্র।

প্রধান ফোকাস নারীদের উপর, কিন্তু পুরুষরাও যোগ্য।

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

  • জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এর ফটোকপি।
  • ২ কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি।
  • আয় বা ব্যবসার প্রমাণ (ট্রেড লাইসেন্স, বিল ইত্যাদি)।
  • ঠিকানার প্রমাণ (বিদ্যুৎ/গ্যাস বিল)।
  • গ্রুপ সদস্যদের NID ও ছবি (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।

এগুলো নিকটস্থ শাখায় জমা দিন।

দিশা এনজিও লোনের আবেদন প্রক্রিয়া

প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ এবং দ্রুত:

  1. নিকটস্থ দিশা এনজিও শাখা সমূহ এ যান এবং তথ্য সংগ্রহ করুন।
  2. আবেদন ফর্ম পূরণ করুন।
  3. কাগজপত্র সংযুক্ত করে জমা দিন।
  4. ফিল্ড অফিসার তথ্য যাচাই করবেন (বাড়ি/ব্যবসা পরিদর্শন সহ)।
  5. যাচাই শেষে চুক্তি স্বাক্ষর।
  6. ৭-১৪ দিনের মধ্যে টাকা হাতে বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসে পাবেন।

দিশা এনজিওর ঋণের সুদের হার ও কিস্তি

সুদের হার সাশ্রয়ী—সাধারণত ফ্ল্যাট ২০% (বার্ষিক কার্যকর ১৫-২৫%)। কিস্তি সাপ্তাহিক বা মাসিক। উদাহরণ: ৫০,০০০ টাকার ঋণে মাসিক কিস্তি প্রায় ১,২৫০ টাকা। মেয়াদ ৬ মাস থেকে ২ বছর। নিয়মিত পরিশোধ করলে ক্রেডিট স্কোর উন্নত হয় এবং পরবর্তী ঋণের পরিমাণ বাড়ে।

দিশা এনজিওর সুবিধা ও অসুবিধা

সুবিধা:

  • সহজ এবং দ্রুত আবেদন প্রক্রিয়া।
  • নারীকেন্দ্রিক বিভিন্ন ঋণ অপশন।
  • প্রতিযোগিতামূলক সুদের হার এবং সঞ্চয় সুবিধা (জেনারেল, স্পেশাল, ভলান্টারি)।
  • অতিরিক্ত শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রশিক্ষণ।
  • বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক ১৯ জেলায়।

অসুবিধা:

  • প্রথম ঋণের পরিমাণ কম (৩০,০০০ টাকা থেকে শুরু)।
  • কিছু ক্ষেত্রে গ্রুপ মেম্বারশিপ বাধ্যতামূলক।

সাফল্যের গল্প

দিশা এনজিওর মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের জীবন বদলে গেছে। উদাহরণস্বরূপ:

  • রহিমা বেগম (চান্দিনা): জাগরণ লোন নিয়ে মুরগির ফার্ম শুরু করেন। এখন মাসে ১৫,০০০+ টাকা আয়, সন্তানদের শিক্ষা চলছে স্বচ্ছন্দে।
  • আব্দুল করিম (কচুয়া): সুফলন লোন দিয়ে কৃষি ব্যবসা বাড়ান। এখন স্থানীয় বাজারে সবজি সরবরাহ করে পরিবারের আয় দ্বিগুণ করেছেন।

এই গল্পগুলো দেখায় যে সঠিক সহায়তায় স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নেয়।

অন্যান্য এনজিওর সাথে তুলনা

সংস্থা সুদের হার ঋণের পরিমাণ (টাকা) মেয়াদ বিশেষ সুবিধা
দিশা এনজিও ১৫-২৫% ৩০,০০০-১০ লাখ ৬ মাস-২ বছর কৃষি ফোকাস, নারী ক্ষমতায়ন
ব্র্যাক ১৫-২৫% ৫০,০০০-৫০ লাখ ৬ মাস-৩ বছর বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, প্রশিক্ষণ
গ্রামীণ ব্যাংক ১৮-২২% ৩০,০০০-৩০ লাখ ১-২ বছর গ্রুপ-ভিত্তিক ঋণ
আশা ১৬-২৪% ৪০,০০০-৪০ লাখ ৬ মাস-২ বছর নারী কেন্দ্রিক প্রকল্প

দিশা এনজিওর স্থানীয় কেন্দ্রীভূততা এবং কৃষি ফোকাস এটিকে অনন্য করে।

যোগাযোগ তথ্য

হেড অফিস: ই/১১, পল্লবী এক্সটেনশন, মিরপুর, ঢাকা-১২১৬। ফোন: +৮৮০২৪৮০৩৬৮৮৫, +৮৮০২৫৮০৫২৪১০, ০১৭৩৩২১৯৯০০। ইমেইল: info@disabd.org। ওয়েবসাইট: www.disabd.org।

শেষ কথা

দিশা এনজিও শাখা সমূহ বাংলাদেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বিশ্বস্ত সঙ্গী। এর মাইক্রোফাইন্যান্স এবং অন্যান্য সেবা আর্থিক স্বাধীনতা এবং টেকসই উন্নয়নের পথ দেখায়। যদি আপনি ব্যবসা শুরু করতে চান বা সহায়তা প্রয়োজন, তাহলে নিকটস্থ শাখায় যোগাযোগ করুন। আরও তথ্যের জন্য ওয়েবসাইট ভিজিট করুন। আপনার অভিজ্ঞতা শেয়ার করুন কমেন্টে—এটি অন্যদের উপকার করবে

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button